স্কটিশ ভূতত্ত্ববিদ জেমস হাটনের ৩০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে স্কটল্যান্ডের উপকূলরেখা ধরে এক মাইল দীর্ঘ হাঁটার একটি পথ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ওই পথের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডিপ টাইম ট্রেইল’। এই ট্রেইল বেরউইকশায়ারের খাড়া উপকূলের ওপর দিয়ে দর্শনার্থীদের সেই শিলাস্তরে নিয়ে যায়, যেখানে জেমস হাটন পৃথিবীর বয়স যে মানুষের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি—তার প্রমাণ খুঁজে পেয়েছিলেন।
জেমস হাটনের জন্ম ১৭২৬ সালে। তিনি ১৭৯৭ সালে মারা যান। তাঁকে প্রায়ই ‘আধুনিক ভূতত্ত্বের জনক’ বলা হয়। স্কটিশ লেখক ও সাংবাদিক স্টুয়ার্ট কেনি সম্প্রতি ডিপ টাইম ট্রেইল ঘুরে এসেছেন।
কেনি বলেন, ‘আমি স্কটল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত সিকার পয়েন্টে ঘাসে ঢাকা খাড়া উপকূলে দাঁড়িয়ে আছি। এটি একটি পাথুরে শিলাস্তর। আমি ডিপ টাইম ট্রেইলের শেষ দর্শনস্থলে দাঁড়িয়ে, সামনে উত্তর সাগরের বিস্তৃত নীলাভ জলরাশি। এক ঘণ্টার এই সহজ যাতায়াতের হাঁটাপথটি দর্শনার্থীদের বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ওই আবিষ্কারের কাছে নিয়ে যায়, যে স্থানের আবিষ্কার পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে।’
ভূতত্ত্ববিদ্যার জনক জেমস হাটনের জন্ম এই পথের কাছের শহর এডিনবরায়। ১৭৮৮ সালে সিকার পয়েন্ট প্রথমবার দেখার বহু আগেই হাটন তাঁর যুগান্তকারী তত্ত্বটি উপস্থাপন করেছিলেন। সেটি হলো, ‘ক্ষয় ও পুনর্গঠনের চক্রের মাধ্যমে পৃথিবীপৃষ্ঠ গঠিত হয়েছে’।
‘হাটনস আনকনফরমিটি’ নামে পরিচিত এ শিলাস্তরই হাটনকে বিশ্বের সামনে তাঁর এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ এনে দিয়েছিল।
সিকার পয়েন্টে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন শিলার ওপর অপেক্ষাকৃত অনেক নবীন আনুভূমিক বেলেপাথরের স্তর রয়েছে। এতে পৃথিবীর ইতিহাসের এমন এক বিশাল সময়ের ব্যবধান প্রকাশ পায়, যার ব্যাখ্যা ১৮০০ শতকের ধারণা দিয়ে করা সম্ভব ছিল না। ভূতাত্ত্বিক সময়ের এই বিশাল পরিসর এখন ডিপ টাইম নামে পরিচিত। নতুন এই ট্রেইলের মূল ধারণাই হলো ডিপ টাইম।
ডিপ টাইমের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলা
ডিপ টাইম ট্রেইলটি পিজ বে–এর কাছ থেকে শুরু হয়ে খাড়া উপকূল ধরে এগিয়ে গেছে। এ পথ ধরে চলতে চলতে দেখা মেলে হাটনের লেখনী খোদাই করা পাথর এবং ব্যাখ্যামূলক তথ্যফলক, যেগুলো থেকে বিশেষজ্ঞদের অডিও ভাষ্য শোনা যায়। ফলে হাঁটতে হাঁটতেই স্কটিশ এই বিজ্ঞানীর গল্প জানা যায়।
অডিও ভাষ্যের শুরুতেই বিজ্ঞানী, লেখক ও স্কটিশ জিওলজি ট্রাস্টের সাবেক চেয়ার ড. এলসা পানচিরোলির কণ্ঠ শোনা যায়। তিনি দর্শনার্থীদের ট্রেইলে স্বাগত জানান এবং জেমস হাটন ও সিকার পয়েন্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
কিছুটা এগিয়ে গেলেই সেন্ট হেলেনস কার্ক গির্জা। ২৩৮ বছর আগে হাটন যখন এখানে এসেছিলেন, তখনই লাল বেলেপাথরে নির্মিত গির্জাটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় ছিল। গির্জাটির চারপাশে রয়েছে গ্রেওয়াকি দিয়ে তৈরি ডাইক (পাথরের উঁচু দেয়াল)। গ্রেওয়াকি হলো গাঢ় রঙের শক্ত ধরনের বেলেপাথর, পুরো উপকূলে এ ধরনের বেলেপাথর দেখতে পাওয়া যায়।
আরও সামনে এগোতে থাকলে একটি খাঁজকাটা পাথরের ডাইক লেখককে একটি বেঞ্চের কাছে নিয়ে যায়। ওই বেঞ্চে বসে স্কটল্যান্ডের পূর্ব উপকূলের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের তুলনায় পূর্ব উপকূলের প্রাকৃতিক দৃশ্য অনেক কোমল। কারণ, পশ্চিম উপকূলটি আটলান্টিক মহাসাগরের পূর্ণ শক্তির আঘাতে গড়ে উঠেছে।
উপকূল বরাবর তাকালে দেখা যায়, ঢেউখেলানো সবুজ পাহাড় ও কৃষিজমি বর্ডারল্যান্ডের খাড়া উপকূলের দিকে নিচে নেমে গেছে। সেখান থেকে খাড়া ঢাল নেমে গেছে সোনালি সৈকত ও নির্জন ছোট ছোট উপসাগরে। দেয়ালে বসানো একটি ইটে খোদাই করা হাটনের একটি উক্তিতে লেখা রয়েছে, ‘প্রকৃতির মধ্যে প্রজ্ঞা, শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিকতা রয়েছে।’
হাটন তাঁর গবেষণায় পর্যবেক্ষণনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন, যা সে সময় অস্বাভাবিক ছিল। তিনি কাছাকাছি থাকা তাঁর দুটি খামারকে কর্মশালাভিত্তিক গবেষণাগারে পরিণত করেন এবং কীভাবে ধীরে ধীরে চক্রাকারে মাটি ক্ষয় হয় এবং আবার পুনর্গঠিত হয়, তা পর্যবেক্ষণ করতেন।
হাটন স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে শিলার নমুনাও সংগ্রহ করেছিলেন। আইল অব অ্যারান এবং কাছের জেডবার্গে হাটন আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ‘আনকনফরমিটির’ সন্ধান পান। তবে সিকার পয়েন্টই হয়ে ওঠে তাঁর তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
সিকার পয়েন্ট বেয়ে ওঠা
জুন মাসের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে সাংবাদিক স্টুয়ার্ট কেনি সিকার পয়েন্টে যান। ঝলমলে নীল আকাশের নিচে দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত সূর্যালোকের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে স্থানটি। তীরে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ভেসে আসছে স্কাইলার্ক ও সুইফট পাখির ডাক। খাড়া উপকূলের চূড়ায় দাঁড়িয়ে কেনির মনে হয়, যেন তিনি এমন এক সীমারেখায় এসে পৌঁছেছেন, যেখানে জলরাশি মিলেছে শিলার সঙ্গে, আর শিলা মিলেছে মানুষের উপলব্ধির সঙ্গে।
ট্রেইলের শেষ দিকে রয়েছে আকর্ষণীয় অর্ধবৃত্তাকার একটি দর্শনস্থল। সেখান থেকে নিচের শিলাগুলো দেখা যায়। সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কীভাবে সেগুলো পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিয়েছে।
দর্শনস্থল থেকে নিচের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, বিখ্যাত এই শিলাস্তর দুই ধরনের পাথর দিয়ে তৈরি। গাঢ় গ্রেওয়াকি প্রায় উল্লম্বভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন প্রতিরক্ষামূলক বর্শার মতো সমুদ্রের ভেতর থেকে উঠে এসেছে। আর লাল বেলেপাথর তার ওপর সমতলভাবে স্তরে স্তরে পড়ে আছে, যেন প্যানকেকের স্তূপ।
হাটন বুঝতে পেরেছিলেন, ওই গাঢ় রঙের শিলাগুলো প্রথমে আনুভূমিক স্তরে গঠিত হওয়ার পর ওপরে উঠে কাত হয়ে গেছে, ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে এবং পরে অপেক্ষাকৃত নবীন বেলেপাথরের নিচে চাপা পড়েছে। এ প্রক্রিয়ায় অবশ্যই সুদীর্ঘকাল পেরিয়ে গেছে। তাই হাটন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান, তৎকালীন বাইবেলভিত্তিক ধারণা অনুযায়ী পৃথিবীর সৃষ্টি ৪০০৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে হতে পারে না; বরং পৃথিবীর বয়স অবশ্যই মানুষের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন।
প্রকৃতপক্ষে আমরা এখন জানি, গ্রেওয়াকি শিলাগুলো সাড়ে ৪৩ কোটি বছর আগে একটি প্রাচীন মহাসাগরের তলদেশে তৈরি হয়েছিল।
হাটনের তত্ত্ব অনুযায়ী, ধীরে ধীরে ভূগাঠনিক প্লেটগুলোর একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ হওয়ার পর এবং সেই মহাসাগর বিলীন হয়ে যাওয়ার সময় এগুলো ওপরের দিকে উঠে একটি পর্বতমালা তৈরি করেছিল। বর্তমানে যা অবশিষ্ট রয়েছে, তা হলো সেই পর্বতমালার ক্ষয়প্রাপ্ত অংশ। ওপরের বেলেপাথর তৈরি হয়েছিল আরও সাড়ে ছয় কোটি বছর পরে, যখন বর্তমান স্কটল্যান্ড নিরক্ষরেখার দক্ষিণে অবস্থিত ছিল।
ভূতত্ত্বকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া
ডিপ টাইম ট্রেইলের একটি লক্ষ্য হলো সিকার পয়েন্টকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজে পৌঁছানোর উপযোগী করে তোলা। ভূতত্ত্ববিদদের জন্য এটি আন্তর্জাতিক তীর্থস্থান হলেও এত দিন এটি বেশির ভাগ পর্যটকের নজরের বাইরেই রয়ে গিয়েছিল। এমনকি স্কটল্যান্ডের পর্যটকেরাও সিকার পয়েন্টে খুব একটা যেতেন না।
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্য হান্টেরিয়ানের ভূতত্ত্ব বিভাগের কিউরেটর কেটি স্ট্র্যাং বলেন, ‘আমি আইমাউথে হাইস্কুলে পড়েছি, এলাকাটি আক্ষরিক অর্থেই উপকূলের একটু নিচের দিকে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আগপর্যন্ত আমি সিকার পয়েন্ট সম্পর্কে জানতাম না।’
নতুন ট্রেইল এখন মানুষকে সেখানে নিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন কেটি স্ট্র্যাং। তিনি বলেন, ‘আশা করি, এর মাধ্যমে এমন মানুষদেরও সেখানে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হবে, যাঁরা হয়তো এমনকি কখনো ভূতত্ত্বের কোনো ট্রেইলে হাঁটার কথা ভাবেননি। এটি উপকূলের একটি চমৎকার অংশ।’
লেখক স্টুয়ার্ট কেনি বলেন, ‘সিকার পয়েন্টের দিকে তাকিয়ে আমি বিশালতার অনুভূতি পাই। কয়েক শ মিলিয়ন বছরের পুরোনো শিলার ওপর, একটি প্রাচীন পর্বতমালার অবশিষ্টাংশের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। কেন এই ভূদৃশ্য বিজ্ঞানের অন্যতম বড় অগ্রগতির অনুপ্রেরণা হয়েছিল, তা সহজেই বোঝা যায়।’
‘থিওরি অব দ্য আর্থ’ বইয়ের উপসংহার টানতে গিয়ে এ স্থান সম্পর্কে জেমস হাটন বলেছেন, ‘সেখানে শুরুর কোনো চিহ্ন যেমন নেই, শেষেরও কোনো সম্ভাবনা নেই।’