মুষলধারে বৃষ্টি, কাদাপানি আর বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেছেন হাজার হাজার মুসল্লি। রেওয়াজ অনুযায়ী, বন্দুকের ফাঁকা গুলির শব্দে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় শুরু হয় জামাত।
এবার শোলাকিয়ায় অনুষ্ঠিত হলো ঈদুল আজহার ১৯৯তম জামাত। নামাজে ইমামতি করেন মুফতি মাওলানা আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ।
আজ ভোর থেকেই আকাশ ছিল মেঘলা। এর মধ্যেই দলে দলে মুসল্লি মাঠে আসতে থাকেন। কেউ ছাতা, কেউ পলিথিন, আবার কেউ জায়নামাজ মাথায় দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে অবস্থান নেন।
বৈরী আবহাওয়া ও টানা বৃষ্টির মধ্যেও মাঠ ছাড়েননি মুসল্লিরা। কাদামাখা মাঠেও তাঁদের উৎসাহে ভাটা পড়েনি। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রবেশপথে প্রত্যেক মুসল্লির দেহতল্লাশি করা হয়। নামাজ চলাকালে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে অনেকে পলিথিন বিছিয়ে, কেউ আবার কাদাপানিতেই সেজদা দিয়ে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে বৃষ্টিতে ভিজেই মুসল্লিরা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় মোনাজাতে অংশ নেন।
ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহায় সাধারণত শোলাকিয়ায় মুসল্লির সংখ্যা কিছুটা কম হয়। কারণ, এ ঈদে পশু কোরবানির প্রস্তুতি ও ব্যস্ততা থাকে। এরপরও দীর্ঘদিন ধরে শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় করে আসছেন এমন অনেক মুসল্লি এবারও উপস্থিত ছিলেন।

করিমগঞ্জ উপজেলার সাঁতারপুর এলাকার রইছ উদ্দিন বলেন, তিনি টানা ৫৫ বছর শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ আদায় করছেন। এবারের ঈদে প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও নামাজ আদায় করতে পেরে তিনি আনন্দিত। তবে ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহায় মুসল্লির সংখ্যা কম হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আশপাশের এলাকার মানুষকে শোলাকিয়ায় নামাজ আদায়ে উৎসাহিত করা গেলে মাঠ আরও বেশি মুসল্লিতে পূর্ণ হবে।
জামাতে অংশ নেন কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহসহ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্টজনেরা। পরে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এ সময় ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ঈদগাহ ময়দান।
ঈদগাহ ময়দানে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা। সকাল থেকেই মাঠে বিজিবি, র্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, সাদাপোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ ও বোমা ডিসপোজাল টিমের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। পুরো মাঠ সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়। দূরদূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধায় চালু করা হয় দুটি বিশেষ ট্রেন।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও মুসল্লিরা শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে নামাজ আদায় করেছেন। এ জন্য তিনি আগত মুসল্লিদের ধন্যবাদ জানান।
জনশ্রুতি আছে, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহে একসঙ্গে সোয়া লাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই ‘সোয়া লাখিয়া’ শব্দ থেকেই পরবর্তী সময়ে ‘শোলাকিয়া’ নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। তবে এ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্নমতও রয়েছে। আরেকটি মতে, মোগল আমলে এ অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ‘শ লাখ’ বা এক কোটি টাকা। সেখান থেকেই কালের পরিক্রমায় ‘শোলাকিয়া’ নামের প্রচলন।