কলম্বোর হোটেলে জায়গা নেই। প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের ৩৫ হাজার আসনের সব টিকিটও শেষ। কালোবাজারে মিললেও দাম চার গুণ বেশি। ভারত থেকে কলম্বো যাওয়ার ফ্লাইটে টিকিটের দামও আকাশছোঁয়া। শ্রীলঙ্কার ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট থেকে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনে শ্রীলঙ্কায় আসা ১ লাখ পর্যটকের প্রায় ২০ শতাংশই এসেছেন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি দেখতে।

আজ সেই ম্যাচ—যে ম্যাচ হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছিল ক্রিকেটটাই। শেষ পর্যন্ত আইসিসির কূটনৈতিক তৎপরতায় এ ম্যাচ ও ক্রিকেট পুনরুদ্ধার হলেও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ এমনিতেই ক্রিকেটে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াই, এবার টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে রাজনৈতিক কারণে ম্যাচটি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়াই কি মানুষের আগ্রহের পারদ চূড়ায় ওঠার কারণ? নইলে বার্তা সংস্থা এএফপি কীভাবে ধারণা করে ‘শোডাউন ইন কলম্বো’য় ভাঙতে পারে দর্শকের রেকর্ড!

অথচ কিছুদিন আগে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনই ভেঙে যেতে বসেছিল। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ায় বাংলাদেশ দলকে নিরাপত্তাশঙ্কায় ভারতে পাঠাতে রাজি হয়নি বিসিবি। কিন্তু বিসিবির শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ আইসিসি যেমন মানেনি, তেমনি বাংলাদেশও নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় শেষ পর্যন্ত তাদের ছাড়াই হচ্ছে এবারের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ।

সেই দৃশ্য, ২০২৫ এশিয়া কাপ ফাইনাল শেষে চ্যাম্পিয়ন ভারতের অদৃশ্য ট্রফি নিয়ে উদ্‌যাপন
সেই দৃশ্য, ২০২৫ এশিয়া কাপ ফাইনাল শেষে চ্যাম্পিয়ন ভারতের অদৃশ্য ট্রফি নিয়ে উদ্‌যাপনএএফপি

ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরুর জ্বালামুখ ছিল বাংলাদেশের বাদ পড়ার ঘটনাই। কারণ, পাকিস্তান এরপরই কলম্বোর আজকের ভারত ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দেয়। স্বয়ং দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ঘোষণা দেন—বাংলাদেশের পাশে থাকতেই তাঁদের এই সিদ্ধান্ত।

পাকিস্তানে সিদ্ধান্ত অটল থাকলে বিশ্ব ক্রিকেটই বড় আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়ত। আইসিসি তাই উদ্যোগী হয়ে লাহোরে পিসিবি ও বিসিবির সঙ্গে যৌথ সভা করে সংকট নিরসনের জন্য। সেই সভায় আইসিসি বেশ কিছু শর্ত পূরণের আশ্বাস দেওয়ার পরই পাকিস্তান সরকার পিসিবিকে ম্যাচটি খেলার অনুমতি দেয়।

খেলাটা ক্রিকেটের চিরাচরিত চেতনার মধ্যেই হওয়া উচিত। আমি কী আশা করি সেটা বিষয় নয়। ক্রিকেট শুরুর পর থেকে যেভাবে খেলাটা হয়ে আসছে, সেভাবেই এটা খেলা উচিত। বাকি সিদ্ধান্ত তাদের (ভারত), তারা যা খুশি করতে পারে।সালমান আগা, অধিনায়ক, পাকিস্তান

তবে এখন আর এটি শুধু একটি ক্রিকেট ম্যাচই নয়; ভারত–পাকিস্তান মহারণের বাইরেও এই ম্যাচের একটি পরিচিতি দাাঁড়িয়ে গেছে। এটি এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে উপমহাদেশীয় ক্রিকেটের বরফ গলানোর কূটনীতির উপলক্ষও। আজকের ম্যাচে তাই আইসিসি আমন্ত্রণ জানিয়েছে এশিয়ার বড় পাঁচটি বোর্ডের প্রধানদের।

পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আগা
পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আগা, এএফপি

ক্রিকেট মাঠে ভারত–পাকিস্তান বৈরিতা বহু বছরের পুরোনো। নতুন করে সেটি সামনে আসে গত বছর সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপে দুই দলের অধিনায়ক ও খেলোয়াড়দের হাত না মেলানোর ঘটনায়। এমনকি এশিয়া কাপের ট্রফিও বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি ভারতকে। দুই দেশের মধ্যে থাকা রাজনৈতিক উত্তেজনারই প্রভাব পড়েছিল আসলে এশিয়া কাপে। টুর্নামেন্টের তিন ম্যাচেই হারা পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান অবশ্য গতকাল কলম্বোর সংবাদ সম্মেলনে খেলোয়াড়ি চেতনাকে সামনে টেনে বল ঠেলেছেন ভারতের কোর্টে।

‘খেলাটা ক্রিকেটের চিরাচরিত চেতনার মধ্যেই হওয়া উচিত। আমি কী আশা করি সেটা বিষয় নয়। ক্রিকেট শুরুর পর থেকে যেভাবে খেলাটা হয়ে আসছে, সেভাবেই এটা খেলা উচিত। বাকি সিদ্ধান্ত তাদের (ভারত), তারা যা খুশি করতে পারে’—বলেছেন সালমান।

দুই দলের অধিনায়কই জানিয়েছেন, অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও তাঁরা খেলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। সূর্যকুমার আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘এই ম্যাচের জন্য আমাদের ফ্লাইট বুক করা ছিল। মনোযোগ ছিল শুধু প্রস্তুতিতে।’

তবে সূর্যের মেজাজ গতকাল তেমন গনগনে ছিল না। ওপেনার অভিষেক শর্মা খেলতে পারবেন কি না— প্রশ্নে খুঁচিয়েছেন সালমানকে। ‘সালমান চাইলে অভিষেক খেলবে’—বলেন হালকা মেজাজে থাকা সূর্য। পরে অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠা অভিষেক খেলবেন বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি। কিন্তু নিশ্চিত করতে কিছু বলেননি পাকিস্তানের সঙ্গে হাত মেলাবেন কি না সেই প্রশ্নের উত্তরে, ‘টসের সময় দেখা যাবে, ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন।’

ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব
ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবএএফপি

টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ৮ বার ভারতের মুখোমুখি হয়ে একবারই জিতেছে পাকিস্তান। কিন্তু তাদের দ্বৈরথে অতীত পরিসংখ্যানের প্রভাব থাকে সামান্যই। আগে কী হয়েছে না হয়েছে, সেটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সামনে থাকা ম্যাচটি জেতা। সে লক্ষ্যে আজ পাকিস্তানের তুরুপের তাস হয়ে উঠতে পারেন অফ স্পিনার উসমান তারিক। বোলিং অ্যাকশনের জন্য তাঁকে অন্য স্পিনারদের চেয়ে একটু আলাদাই লাগে। প্রশ্ন আছে তাঁর অ্যাকশন নিয়েও। যদিও সূর্য উসমানকে কীভাবে খেলবেন, শুধু সেটা নিয়েই বলেছেন, ‘সিলেবাসের বাইরে প্রশ্ন হলেও সেটা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। সে একটু অন্য রকম, তাই বলে আমরা তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারি না।’

অবশ্য না চাইলেও ভারত, পাকিস্তান দুই দলকেই তৃতীয় এক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে হতে পারে—প্রকৃতি! শ্রীলঙ্কার আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস, সন্ধ্যায় ম্যাচ শুরুর আগে বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে কলম্বোতে। বৃষ্টির সম্ভাবনা ৫০ থেকে ৭০ ভাগ। দুটি করে ম্যাচ জেতায় এটা দুই দলের জন্য সুপার এইটে ওঠার ম্যাচও। যে জিতবে তাঁরাই উঠে যাবে। আর বৃষ্টিতে ম্যাচ পণ্ড হলে ভাগাভাগি হবে পয়েন্ট, কারণ রিজার্ভ ডে নেই। তবে আগুনে লড়াইয়ের সবকিছুই যে ম্যাচের আগে মজুত আছে, সে ম্যাচে বৃষ্টি কাম্য নয় কারোরই।

২০২২ সালের পর ভারতকে হারাতে পারেনি পাকিস্তান
২০২২ সালের পর ভারতকে হারাতে পারেনি পাকিস্তানরয়টার্স

কেউ কেউ বলছেন, আজকের ম্যাচটা আসলে পাকিস্তানের তিন স্পিনার বনাম ভারতের ব্যাটসম্যানদের লড়াই। আবার বরুণ চক্রবর্তী–অক্ষর প্যাটেলদের কারণে উল্টোটাও বলা যায়। প্রেমাদাসার উইকেট একটু মন্থর হলেও স্পিনবান্ধব বলা যাবে না। এ মাঠে আন্তর্জাতিক টি–টুয়েন্টিতে পেসাররা পেয়েছেন ৩২৩ উইকেট, স্পিনাররা ২৮২। টি–টুয়েন্টি সংস্করণে এ মাঠে ১৫ ম্যাচের ১১টিতেই জিতেছে ভারত। পাকিস্তান ৭ ম্যাচ খেলে জিতেছে ৫টি।

এসব সংখ্যায় সম্ভাব্য সমীকরণ মেলানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, আজকের ম্যাচ দিয়ে উপমহাদেশের ক্রিকেট থেকে বৈরিতার বাতাস দূর করে দেওয়া। কঠিন সেই কাজটা পারবে তো আইসিসি?

লা লিগায় গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রিয়াল সোসিয়েদাদের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। এই ম্যাচে ঘরের মাঠে দাপট দেখিয়ে জয় তুলে নিয়েছে লস ব্লাঙ্কোসরা। এতে এক ম্যাচ বেশি খেলে বার্সেলোনাকে টপকে পয়েন্ট টেবিশ শীর্ষে উঠেছে রিয়াল মাদ্রিদ।

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে সোসিয়েদাদের বিপক্ষে ৪-১ গোলে জিতেছে আলভারো আরবেলোয়ার দল। এদিন ম্যাচে পেনাল্টি থেকে জোড়া গোল করেছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, একবার করে জালের দেখা পেয়েছেন গার্সিয়া ও ফেদে ভালভের্দে। সফল স্পট কিকে সোসিয়েদাদের একমাত্র গোলটি করেছেন মিকেল ওইয়ারসাবাল।

ঘরের মাঠে পঞ্চম মিনিটেই এগিয়ে যায় রিয়াল। ট্রেন্ট অ‍্যালেকজ‍্যান্ডার-আর্নল্ডের চমৎকার ক্রসে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে জাল খুঁজে নেন গার্সিয়া। সঙ্গে লেগে থাকা খেলোয়াড়কে এড়িয়ে চলতি বল পা ছুঁয়ে একটু দিক পাল্টে দেন তিনি। ঝাঁপিয়েও বলের নাগাল পাননি সোসিয়েদাদ গোলরক্ষক।

গার্সিয়ার দারুণ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর গতি কমিয়ে দেয় রিয়াল। সে সময় ভালো ফুটবল খেললেও তেমন একটা সুযোগ তৈরি করতে পারছিল না সোসিয়েদাদ। ২১তম মিনিটে সফল স্পট কিকে সমতা ফেরান ওইয়ারসাবাল। 

ডিফেন্ডার ডিন হাউসেন ডি বক্সে ইয়ানজেল এররেরাকে ফাউল করায় পেনাল্টি পায় সোসিয়েদাদ। চার মিনিট পর স্পট কিক থেকে রিয়ালকে ফের এগিয়ে নেন ভিনিসিয়ুস। ব্রাজিল ফরোয়ার্ডকে ফাউল করাতেই পেনাল্টি পায় রিয়াল। ৩১তম মিনিটে ব‍্যবধান আরও বাড়ান ভালভের্দে। ডি বক্সের ঠিক বাইরে বল পেয়ে জোরাল শটে ঠিকানা খুঁজে নেন উরুগুয়ের এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ব‍্যবধান আরও বাড়ান ভিনিসিউস। ৪৮তম মিনিটে সফল স্পট কিকে নিজের দ্বিতীয় ও দলের চতুর্থ গোলটি করেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। তাকেই ফের ইয়ন আরামবুরু ফাউল করায় পেনাল্টি পায় রিয়াল।

৬০তম মিনিটে মাঠে নামেন রিয়াল অধিনায়ক ও অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার দানি কারভাহাল। ৬১তম মিনিটে ইয়ন মার্তিনের হেড চমৎকার রিফ্লেক্সে ঠেকিয়ে দেন রেয়াল গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া। দুই মিনিট পর আইহেন মুনিয়োসের গতিময় শট এগিয়ে এসে শরীর দিয়ে ঠেকান তিনি।

৭০তম মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল প্রায় পেয়েই যাচ্ছিলেন গার্সিয়া। তবে গোললাইন থেকে শট ঠেকিয়ে তাকে হতাশ করেন মার্তিন। ৮৪তম মিনিটে রেয়ালের জালে বল পাঠালেও অফসাইডের জন‍্য গোল পায়নি সোসিয়েদাদ।

৬ মিনিট পর একই অভিজ্ঞতা হয় রিয়ালের। আর্দা গিলেরের ফ্রি কিকে হেডে জালে বল পাঠালেও গোল পাননি ভিনিসিয়ুস। তিনি নিজেই অফসাইডে ছিলেন, তাই হয়নি হ‍্যাটট্রিক।

এতে ২৬ ম‍্যাচে রিয়ালের পয়েন্ট ৬০। এক ম‍্যাচ কম খেলা বার্সেলোনা ৫৮ পয়েন্ট নিয়ে আছে দুই নম্বরে।

 

জেতার জন্য দরকার ছিল ১৭৬ রান। দক্ষিণ আফ্রিকা কি না ৪ ওভারেই তুলে ফেলল ৬২ রান। জয়টা তখনই তাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছিল। ১৭ বল ও ৭ উইকেট হাতে রেখে জয় পায় তারা। আহমেদাবাদে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয়ে তিন ম্যাচের সবগুলোতে জিতে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম দল হিসেবে সুপার এইটেও পৌঁছে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা।

ঝোড়ো শুরুর পর দক্ষিণ আফ্রিকার রান তাড়াটা আর কঠিন হওয়ার কথা ছিল না এমনিতে। ১৩ বলে ২০ রান করে কুইন্টন ডি কক আউট হলে পঞ্চম ওভারেই অবশ্য তাদের উদ্বোধনী জুটিটা থেমে যায়।
তবে ৪৪ বলে ৮ চার ও ৪ ছক্কায় আরেক ওপেনার অধিনায়ক এইডেন মার্করাম প্রোটিয়াদের জয়ে এনে দিয়েই ফিরেছেন ড্রেসিংরুমে।  মাত্র ১৯ বলে ফিফটি করেছেন মার্করাম।

দ্রুততম ফিফটির কয়েকটি রেকর্ডও করেছেন নিজের নামে। ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কুইন্টন ডি ককের ২১ বলের ফিফটি ছাড়িয়ে এখন টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার দ্রুততম পঞ্চাশের রেকর্ডটা তাঁরই।

মার্করামের ঝড়ে ভর করে ৭.৩ ওভারেই দলীয় ১০০–ও করে দক্ষিণ আফ্রিকা। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে তৃতীয় দ্রুততম দলীয় ১০০ করার রেকর্ড। এরপর আর কাজটা কঠিন হয়নি দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য।

শুরুতে ব্যাট করা নিউজিল্যান্ডের রানটা এক সময় ২০০ ছাড়িয়ে যাবে বলেই মনে হচ্ছিল। পাওয়ার প্লের ৬ ওভারে ৮৩ রান তুলে ফেলে তারা। ততক্ষণে যদিও ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল।

১৪ ওভারে তাদের রান ছিল ১৩৮। তবে হুট করেই ৭ রানের ব্যবধানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলে নিউজিল্যান্ড। পরে আর বেশি দূর যেতে পারেনি। ৬ চার ও ২ ছক্কায় ২৬ বলে সর্বোচ্চ ৪৮ রান করেন মার্ক চাপম্যান। দক্ষিণ আফ্রিকার মার্কো ইয়ানসেন নেন ৪ উইকেট।

বন্ধুর বাড়িতে ভিডিও গেম খেলতে গিয়ে ৯ বছর বয়সী এক ফুটবলপাগল ছেলে প্রথম দেখেছিল ৮ বছরের এক মেয়েকে। চোখে চোখ পড়তেই মনের ভেতর কাঁপন। শুরু হয়েছিল এক চুপচাপ প্রেম, যা পরে গড়ায় পরিণয়ে। আজ ভালোবাসা দিবসে পাঠকদের জন্য লিওনেল মেসি ও আন্তোনেল্লা রোকুজ্জোর দারুণ প্রেমের গল্প।

প্রথম দেখা

গল্পটা শুরু হয়েছিল এক বন্ধুর বাড়িতে।
প্রেমের গল্পগুলো অবশ্য এমনই হয়। বন্ধুর বাড়িতে দেখা, প্রথম দেখাতেই ভালো লাগা, বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাওয়া...শুরুটা এমন ছিল লিওনেল মেসিরও।
১৯৯৬ সালের কথা সেটা। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহর। মেসির বয়স তখন ৯। সারা দিন ফুটবল নিয়ে পড়ে থাকা ছেলেটা মাঝেমধ্যে বন্ধু লুকাস স্কাগলিয়ার বাড়িতে যেত ভিডিও গেম খেলতে। এ রকমই এক দিনে মেসি ও স্কাগলিয়া যে ঘরে বসে গেম খেলছিল, সেখানে ঢোকে একটি মেয়ে।
‘তোমাদের কিছু লাগবে?’—জিজ্ঞেস করেছিল মেয়েটা।
‘না’, উত্তর দিয়েছিল স্কাগলিয়া।
মেয়েটা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মেসি বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কে রে এটা?’
‘আমার কাজিন, আন্তোনেল্লা।’
৯ বছরের মেসি সেই প্রথম দেখেছিল ৮ বছরের আন্তোনেল্লা রোকুজ্জোকে। সেই দেখাই বদলে দিয়েছিল মেসির দুনিয়া।

বন্ধুর বাড়িতে প্রথম দেখা হয়েছিল মেসি-আন্তোনেল্লার
বন্ধুর বাড়িতে প্রথম দেখা হয়েছিল মেসি-আন্তোনেল্লার, আন্তোনেল্লার ইনস্টাগ্রাম
 

গল্পটা অনেক দিন পরে মেসি নিজেই বলেছেন আর্জেন্টাইন এক টেলিভিশনে, ভালোবাসা দিবসের এক অনুষ্ঠানে। এরপর থেকে নাকি মেসি আরও বেশি যেতে শুরু করেছিলেন স্কাগলিয়ার বাড়িতে। তখন উদ্দেশ্য আর শুধু ভিডিও গেম খেলা নয়, যদি আন্তোনেল্লার দেখা মেলে!
কখনো দেখা হতো, কখনো না। কেউ কেউ এটা টেরও পেলেন। মেসির তখনকার কোচ এনরিকে ডমিঙ্গেজ নাকি একবার স্কাগলিয়ার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘লিওকে দেখলাম তোমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে, ঘটনা কী?
স্কাগলিয়ার বাবা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ও আমাদের বের হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা বের হলে ও আমাদের বাড়িতে ঢুকবে। প্রায়ই আসে।’
‘কেন?’
‘আসলে উইকেন্ডে লুকাসের কাজিন আন্তোনেল্লা আসে তো, লিও ওকে খুব পছন্দ করে।’
টের পেয়েছিল হয়তো আন্তোনেল্লাও। নইলে কি আর নিয়ম করে উইকেন্ডে স্কাগলিয়ার বাসায় যেত!

না পাঠানো সেই চিঠি

এখন অবশ্য চিঠির যুগ নয়। তবে মেসির কৈশোরের পৃথিবীতে চিঠির চল ছিল। প্রেমে পড়ে কিশোর মেসিও চিঠি লিখেছিল। একদিন নাকি হোমওয়ার্ক করতে বসে খাতায় আনমনেই লিখেছিল, ‘প্রিয় আন্তোনেল্লা... একদিন তুমি আমার হবে, আমি হব তোমার।’
তবে বরাবরই লাজুক মেসি সেই চিঠি কখনো আন্তোনেল্লাকে পাঠাতে পারেনি।
এই গল্পটাও মেসি নিজেই বলেছেন।

হঠাৎ দূরত্ব

ভালোবাসার গল্পে কিছুটা বিচ্ছেদ, কিছুটা অনাকাঙ্ক্ষিত মোড় না থাকলে কি আর সেটা পূর্ণতা পায়! মেসি-আন্তোনেল্লার গল্পেও এমন বিচ্ছেদ এসেছিল। কিশোর মেসির ফুটবলপ্রতিভার খবর তত দিনে আর্জেন্টিনার রোজারিও ছাড়িয়ে ইউরোপে চলে গেছে। ট্রায়ালে তাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়ে হাতের কাছে পাওয়া একটি ন্যাপকিন পেপারেই তাঁর সঙ্গে চুক্তি করে ফেলে বার্সেলোনা। ১৩ বছরের মেসিকে নিয়ে ২০০০ সালে তাঁর বাবা হোর্হে মেসি পাড়ি জমান বার্সেলোনায়।
বার্সা একাডেমিতে শুরু হলো মেসির নতুন জীবন। মুঠোফোন তখনো সহজলভ্য হয়নি, ইন্টারনেটও না। আন্তোনেল্লার সঙ্গে যোগাযোগের খুব একটা উপায় রইল না মেসির। মাঝেমধ্যে ছুটি কাটাতে রোজারিওতে ফিরলে কখনো দেখা হতো, কখনো না।

মেসি বার্সেলোনায় চলে যাওয়ার পর কিছুদিনের জন্য একা হয়ে গিয়েছিলেন আন্তোনেল্লা
মেসি বার্সেলোনায় চলে যাওয়ার পর কিছুদিনের জন্য একা হয়ে গিয়েছিলেন আন্তোনেল্লাআন্তোনেল্লার ইনস্টাগ্রাম

যেভাবে পুনর্মিলন

২০০৫ সালে আন্তোনেল্লার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী উরসুলা নটজ এক গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়। ওই সময়ে আন্তোনেল্লায় মানসিক অবস্থা কী রকম থাকতে পারে, সেটা জানতেন মেসি। বার্সেলোনা থেকে তাই তখন উড়ে গিয়েছিলেন রোজারিওতে, আন্তোনেল্লাকে সান্ত্বনা দিতে! আর্জেন্টিনার ‘প্যারা টি’ সাময়িকীতে পরে আন্তোনেল্লা নিজেই বলেছেন, ওই কঠিন সময়ে মেসির পাশে দাঁড়ানোটা কতটা সাহায্য করেছিল তাঁকে। ওই পুনর্মিলনী বড় ভূমিকা রেখেছিল তাঁদের ভালোবাসার সম্পর্কটা আরও শক্ত করতে।

প্রেম যেভাবে প্রকাশ্যে

মেসি তত দিনে বার্সেলোনায় এবং ফুটবল-দুনিয়ায় নিজের আগমনী বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। আভাস দিয়েছেন আগামীর মহাতারকা হয়ে ওঠার। আর তারকাদের তো ব্যক্তিজীবনের সবকিছুই গোপন রাখতে হয়। মেসি-আন্তোনেল্লার প্রেম অবশ্য একেবারে গোপন থাকেনি। ২০০৭ সালের দিকে আন্তোনেল্লা নিজেই তাঁর কাছের কয়েকজন বন্ধুকে কথা প্রসঙ্গে জানিয়ে দেন, মেসির সঙ্গে তাঁর হৃদয়ঘটিত ব্যাপারস্যাপার আছে। কিন্তু সেটা গোপন থাকেনি। গুঞ্জন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সংবাদমাধ্যমে। এর বছর দুয়েক পরে এক সাক্ষাৎকারে মেসি নিজেই বলে দেন, আর্জেন্টিনায় এক মেয়ের সঙ্গে তাঁর অনেক দিনের প্রেম! দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে সংবাদমাধ্যমও নিশ্চিত করে দেয়, রোকুজ্জোই সেই আর্জেন্টাইন মেয়ে।

আন্তোনেল্লাই প্রথম জানিয়েছিলেন, মেসির সঙ্গে তাঁর প্রেম চলছে
আন্তোনেল্লাই প্রথম জানিয়েছিলেন, মেসির সঙ্গে তাঁর প্রেম চলছেআন্তোনেল্লার ইনস্টাগ্রাম

প্রেমের টানে বার্সেলোনায়

ভ্যানিটি ফেয়ার এস্পানা পত্রিকা জানায়, আন্তোনেল্লা সেই সময়টায় আর্জেন্টিনায় ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব রোজারিও থেকে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করে দন্তচিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতকোত্তর শুরু করেছিলেন। তবে ভালোবাসার টানে তিনি তখন পড়াশোনা ছেড়ে মেসির কাছাকাছি থাকার সিদ্ধান্ত নেন। চলে যান বার্সেলোনায়। সেখানে গিয়ে অবশ্য মডেলিং শুরু করেন। ভালো ক্যারিয়ারও গড়েন।

অবশেষে বিয়ে

২০১৭ সালের ৩০ জুন রোজারিও ডাউনটাউনের পুলম্যান হোটেল রূপ নিল উৎসবের মঞ্চে। মেসি ও আন্তোনেল্লা—দুই শৈশবের বন্ধু, দুজন চুপি চুপি ভালোবেসে বড় হওয়া মানুষ শপথ নিলেন—‘যতক্ষণ না মৃত্যু আমাদের আলাদা করে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা একে অন্যের সঙ্গে থাকব।’

বিয়ের দিন মেসি ও আন্তোনেল্লা
বিয়ের দিন মেসি ও আন্তোনেল্লাএএফপি

ফুটবলে এই শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত সেই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন নেইমার, সুয়ারেজসহ মেসির তখনকার বার্সেলোনা দলের প্রায় সব সতীর্থ, ছিলেন পপ স্টার শাকিরা (যিনি তখন মেসির সতীর্থ জেরার্ড পিকের স্ত্রী) এবং মেসির আর্জেন্টিনা দলের সতীর্থ ও বন্ধুরা। তত দিনে অবশ্য মেসি-আন্তোনেল্লা জুটির দুই ছেলে থিয়াগো (জন্ম ২০১২) ও মাতেও (জন্ম ২০১৫) পৃথিবীতে চলে এসেছে। বিয়ের এক বছর পর ২০১৮ সালে জন্ম নেয় এই দম্পতির তৃতীয় ছেলে চিরো।

আন্তোনেল্লা কী করেন

বার্সেলোনায় মেসির খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায় উরুগুইয়ান তারকা লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে। সেই সূত্রে, ভালো বন্ধু হয়ে ওঠেন মেসির স্ত্রী আন্তোনেল্লা ও সুয়ারেজের স্ত্রী সোফিয়া বালবিও। ২০১৭ সালে আন্তোনেল্লা ও সোফিয়া মিলে আর্জেন্টিনার ফুটওয়্যার ব্র্যান্ড সারকানির জন্য বার্সেলোনায় একটি বুটিক শপ খোলেন। একই সঙ্গে অ্যাডিডাস এবং স্টেলা ম্যাককার্টনির মতো বিখ্যাত কয়েকটি ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন আন্তোনেল্লা। সব মিলিয়ে তিনি নিজেও এখন বড় তারকা। এক্স বা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট না থাকলেও ইনস্টাগ্রামে আন্তোনেল্লার ৩ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি অনুসারী।

ইনস্টাগ্রামে আন্তোনেল্লার ৩ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি অনুসারী
ইনস্টাগ্রামে আন্তোনেল্লার ৩ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি অনুসারী, আন্তোনেল্লার ইনস্টাগ্রাম

বার্সেলোনার ওয়েবসাইটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসি একবার বলেছিলেন, ‘আন্তোনেল্লার অনেক গুণ। ও যেভাবে প্রতিদিনের কাজ সামলায়, সেটার প্রশংসা করতেই হবে। সব সময় হাসিখুশি থাকে এবং প্রতিদিনের সমস্যাগুলোকে খুব ভালোভাবে সামলায়। সে খুব বুদ্ধিমান এবং সব দিক থেকেই দারুণ।’

এখন দুজনের জীবন

বার্সেলোনা ছেড়ে মেসি ২০২১ সালে পাড়ি জমান প্যারিসে। নতুন সেই শহরে মেসি পরিবারের মানিয়ে নিতে খুব বেশি সমস্যা হয়নি, কারণ আন্তোনেল্লা দারুণভাবে সব সামলেছেন। মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন, ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের সময় আন্তোনেল্লা কীভাবে পাশে ছিলেন, সেটা তো সারা বিশ্বই দেখেছে।
২০২৩ সালের গ্রীষ্মে মেসি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর শুরু হয় নতুন শহরে মেসি পরিবারের নতুন অধ্যায়। সেই জীবন কতটা আনন্দময়, সেটা যাঁরা মেসি বা আন্তোনেল্লাকে ইনস্টাগ্রামে অনুসরণ করেন, তাঁরা তো জানেনই।

 

লিওনেল মেসি যখন ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন, তখন থেকেই কথাটা বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে—‘মেসি-ম্যানিয়া’। তবে এই উন্মাদনা যে কেবল গ্যালারিতে হইহুল্লোড় আর জার্সি বিক্রিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা বোধ হয় খোদ ক্লাবমালিক ডেভিড বেকহামও ভাবেননি।

মেসির ছোঁয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের খেলার জগৎটাই যেন রাতারাতি বদলে গেছে। গ্যালারিতে সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি হলিউড তারকাদের উপচে পড়া ভিড়ই বলে দিচ্ছিল, ফুটবল এখন আর সেখানে কেবল ‘সকার’ নেই, বরং বিনোদনের বড় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

মাঠ ও মাঠের বাইরে গত আড়াই বছর আমেরিকায় চলেছে মেসির একক রাজত্ব। যে ক্লাব আগে কখনো শিরোপার মুখ দেখেনি, আর্জেন্টাইন অধিনায়কের হাত ধরে তারা জিতেছে তিনটি ট্রফি।

এর মধ্যে আছে ২০২৫ সালের এমএলএস কাপও। মাঠের এই সাফল্যের জোয়ার লেগেছে ক্লাবের সিন্দুকেও। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের লিগের ৩০টি ফ্র্যাঞ্চাইজির মধ্যে সবচেয়ে দামি বা মূল্যবান দলে পরিণত হয়েছে ‘দ্য হেরনস’–খ্যাত ইন্টার মায়ামি।

ক্রীড়া অর্থনীতিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম স্পোর্তিকোর হিসাব বলছে, ২০২৬ মৌসুম শুরু করার সময় ইন্টার মায়ামির আনুমানিক মূল্য দাঁড়াবে ১৪৫ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি! মায়ামির এই ঝড়ে শীর্ষ স্থান হারিয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেস এফসি। ১৪০ কোটি ডলার মূল্য নিয়ে তারা এখন তালিকার ২ নম্বরে।

এমএলএস কাপের ট্রফি নিয়ে মায়ামির উদযাপন
এমএলএস কাপের ট্রফি নিয়ে মায়ামির উদযাপনএএফপি

গত এক বছরে ইন্টার মায়ামির বাজারমূল্য বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। মূলত এই ‘লাফ’ দিয়েই তারা ক্যালিফোর্নিয়ার দলটিকে টপকে গেছে। লস অ্যাঞ্জেলেস এফসির প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৯ শতাংশ। তাই মায়ামির গতিবেগের সঙ্গে তারা কুলিয়ে উঠতে পারেনি।

মায়ামির এই ফুলেফেঁপে ওঠার পেছনে শুধু মেসির পায়ের জাদু নয়, কাজ করেছে ক্লাবের বড় পরিকল্পনাও। এ বছরই ক্লাবটি তাদের নতুন স্টেডিয়াম উদ্বোধন করতে যাচ্ছে। আধুনিক এই অবকাঠামো ক্লাবের সম্পদে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

মূল্যমানের বিচারে শীর্ষ পাঁচ দলের বাকিরা হলো লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সি (১১৭ কোটি ডলার), আটলান্টা ইউনাইটেড (১১৪ কোটি ডলার) এবং নিউইয়র্ক সিটি এফসি (১১২ কোটি ডলার)।

সব মিলিয়ে এমএলএসের ৩০টি ক্লাবের গড় মূল্য এখন ৭৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০২১ সালে যখন স্পোর্তিকো প্রথম এই মূল্যায়ন শুরু করেছিল, তার চেয়ে বর্তমানে মূল্য বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। সব ক্লাব মিলিয়ে লিগের মোট সম্পদ এখন প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ফুটবলের এত রমরমা দশা হলেও দেশটির অন্য জনপ্রিয় লিগগুলোর তুলনায় তা এখনো বেশ কম। এনএফএল বা এনবিএর মতো লিগের দলগুলোর সম্পদের পাহাড়ের কাছে এমএলএস এখনো অনেক পিছিয়ে।

লিওনেল মেসির জাদুতেই বদলে গেছে মায়ামি
লিওনেল মেসির জাদুতেই বদলে গেছে মায়ামি, রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের বড় ৫টি লিগের মোট ১৫৪টি দলের তালিকা করলে ইন্টার মায়ামির অবস্থান হয় ১১৬তম। এই তালিকার শীর্ষে থাকা এনএফএলের দল ডালাস কাউবয়েসের মূল্য ১ হাজার ২৮০ কোটি ডলার। বাস্কেটবল–দুনিয়ার গোল্ডেন স্টেট ওয়ারিয়র্সের মূল্য ১ হাজার ১৩৩ কোটি ডলার।

সব হিসাব-নিকাশ শেষে মাঠের লড়াই শুরুর পালা। ২১ ফেব্রুয়ারি পর্দা উঠবে ২০২৬ এমএলএস মৌসুমের। উদ্বোধনী ম্যাচেই মুখোমুখি হবে তালিকার সেরা দুই ‘ধনী’ দল। লস অ্যাঞ্জেলেস এফসির মাঠেই আতিথ্য নেবে মেসির ইন্টার মায়ামি।

আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে পর্দা উঠতে যাচ্ছে নারী এশিয়া কাপ রাইজিং স্টারস টুর্নামেন্টের। এই আসরকে সামনে রেখে অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার ফাহিমা খাতুনকে অধিনায়ক করে শক্তিশালী দল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।

ঘোষিত এই দলে অধিনায়ক ফাহিমার সঙ্গে থাকছেন শামীমা সুলতানা, ইশমা তানজিম ও লতা মণ্ডলের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা। এ ছাড়া দলে ডাক পেয়েছেন রুবাইয়া হায়দার ঝিলিক, জান্নাতুল ফেরদৌস সুমনা, শারমিন সুলতানা, ফারিহা ইসলাম, সানজিদা আক্তার মেঘলা ও তাজ নেহার।

অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে বাংলাদেশ ‘এ’ দলে জায়গা করে নিয়েছেন উদীয়মান তারকা সাদিয়া আক্তার। অন্যদিকে, সবশেষ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ব্রাত্য থাকা জান্নাতুল ফেরদৌস সুমনা আবারও দলে ফিরেছেন। তাকে বাদ দেওয়া নিয়ে ক্রিকেট পাড়ায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হলেও, এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে আবারও নিজেকে প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।

টুর্নামেন্টে ‘বি’ গ্রুপে লড়বে বাংলাদেশ। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকছে শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও স্বাগতিক থাইল্যান্ড।

বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ১৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বাগতিক থাইল্যান্ডের সঙ্গে খেলবেন বাংলাদেশের মেয়েরা। ১৮ ফেব্রুয়ারি গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ মালয়েশিয়া।

এশিয়া কাপে বাংলাদেশের স্কোয়াড: ফাহিমা খাতুন (অধিনায়ক), শামীমা সুলতানা, ইশমা তানজিম, রুবাইয়া হায়দার ঝিলিক, জান্নাতুল ফেরদৌস সুমনা, শরিফা খাতুন, শারমিন সুলতানা, ফারিহা ইসলাম, সাদিয়া আক্তার, ফারজানা ইয়াসমিন, সানজিদা আক্তার মেঘলা, তাজ নেহার, লতা মণ্ডল, সুমাইয়া আক্তার এবং ফাতেমা জাহান।

স্ট্যান্ডবাই– দিশা বিশ্বাস, মিষ্টি রানী সাহা, হালিমাতুল সাদিয়া এবং হাবিবা ইসলাম পিংকি।

নিজেদের দাবিতে অটল থেকে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেললেও বাংলাদেশকে কোনো ধরনের শাস্তি বা জরিমানা করবে না আইসিসি। উল্টো বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০৩১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগেই আরও একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের স্বাগতিক করা হবে বাংলাদেশকে। আজ আইসিসির দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে।

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তান ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত জানানোর পর গতকাল আইসিসির সঙ্গে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভা হয়। আজ রাতেই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম জানান, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি খেলতে পাকিস্তানকে অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। এরপরই আইসিসি বাংলাদেশকে নিয়ে হওয়া এসব সিদ্ধান্তের কথা জানাল।

আইসিসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পিসিবি ও বিসিবির সঙ্গে বৈঠক হয়েছে তাদের। সেখানে এবারের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপসহ দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেটের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের না থাকাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক অনুপস্থিতি’ বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে আইসিসি। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর নিরাপত্তাসংকটের কারণে নিজেদের ম্যাচগুলো ভারতের বদলে শ্রীলঙ্কায় খেলতে চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু আইসিসি তাতে রাজি না হওয়ায় বিশ্বকাপই খেলা হচ্ছে না বাংলাদেশের।

রোববার রাতে লাহোরে আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজার (বাঁ থেকে প্রথম) সঙ্গে বৈঠক করে পিসিবি ও বিসিবি
রোববার রাতে লাহোরে আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজার (বাঁ থেকে প্রথম) সঙ্গে বৈঠক করে পিসিবি ও বিসিবি

আইসিসি জানিয়েছে, গর্ব করার মতো ক্রিকেট ঐতিহ্য এবং বৈশ্বিক ক্রিকেট বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বাংলাদেশের। ২০ কোটির বেশি সমর্থক নিয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রাণবন্ত ক্রিকেট বাজারে ক্রিকেটের বিকাশে তারা তাদের সহায়তা অব্যাহত রাখবে। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করায় বাংলাদেশের ক্রিকেটে কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যেন না ফেলে, সেটিও দেখবে আইসিসি।

কোনো শাস্তি হবে না

পরে দুটি বিষয়ের কথা আলাদা করে উল্লেখ করেছে বিসিবি। বিশ্বকাপ না খেলায় বিসিবির ওপর বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো আর্থিক, খেলা নিয়ে অথবা প্রশাসনিক জরিমানা বা শাস্তি আরোপ করা হবে না। বিসিবি চাইলে বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটির (ডিআরসি) কাছে যাওয়ার অধিকার রাখে। আইসিসির বর্তমান বিধিমালার আওতায় এই অধিকার বিদ্যমান এবং তা অক্ষুণ্ন থাকবে।

বাড়তি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের আয়োজক স্বত্ব

এ ছাড়া আইসিসির সঙ্গে বিসিবি ও পিসিবির সমঝোতার অংশ হিসেবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ২০৩১ সালের বিশ্বকাপের আগেই বাংলাদেশ একটি আইসিসি ইভেন্ট আয়োজন করবে, যা আইসিসির প্রচলিত আয়োজক নির্বাচন প্রক্রিয়া, সময়সূচি এবং পরিচালনাগত শর্তাবলির অধীন থাকবে। ২০৩১ সালে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে ওয়ানডে বিশ্বকাপ আয়োজনের কথা বাংলাদেশের।

আইসিসির প্রধান নির্বাহী সনযোগ গুপ্তাকে উদ্ধৃত করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে লেখা হয়েছে, ‘টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি দুঃখজনক। তবে এটি বাংলাদেশকে একটি প্রধান ক্রিকেট জাতি হিসেবে আইসিসির দীর্ঘস্থায়ী অঙ্গীকারকে পরিবর্তন করবে না। বিসিবিসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আমরা দেশটির ক্রিকেটের টেকসই উন্নয়ন এবং খেলোয়াড় ও সমর্থকদের জন্য ভবিষ্যৎ সুযোগ আরও শক্তিশালী করার দিকে মনোনিবেশ করে যাচ্ছি।’

আগামী মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠেয় উইমেন্স এশিয়ান কাপের ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দলে আছেন সুইডেনপ্রবাসী ফরোয়ার্ড আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী। ‎‎প্রথম প্রবাসী নারী ফুটবলার হিসেবে বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন জাপানে জন্ম নেওয়া মাতসুশিমা সুমাইয়া। এবার আনিকাও এ তালিকায় নাম লেখানোর অপেক্ষায়। সুইডেনের ক্লাব ব্রোমপোজকর্নের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলেছেন তিনি। গত মাসে সুইডিশ কাপ দিয়ে ক্লাবটির সিনিয়র দলে অভিষেক। ইউরোপের ফুটবলে খেলার অভিজ্ঞতা এবার বাংলাদেশের ফুটবলে কাজে লাগাতে চাইবেন ২০ বছর বয়সী আনিকা।

আনিকা ছাড়া এশিয়ান কাপের স্কোয়াডে আরও দুই নতুন মুখ আলপি আক্তার ও সৌরভী আফরিন। এই দুজন প্রথমবার জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন। দলে ফিরেছেন আইরিন খাতুন ও সৌরভী আকন্দও। ‎১ থেকে ২১ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার পাঁচ ভেন্যুতে হবে এশিয়ান কাপের ২১তম আসর। বাংলাদেশের গ্রুপে আছে ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন চীন ও ৩ বারের চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়া। আরেক প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তান।

মেয়েদের এশিয়ান কাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল দল চীন। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৪ বার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন তারা। ৩ মার্চ প্রথম ম্যাচেই বর্তমান চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে খেলতে হবে পিটার বাটলারের দলকে।

২০২৬ সাফ অ–১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা খেলোয়াড় আলপি আক্তার সুযোগ পেয়েছেন জাতীয় দলে
২০২৬ সাফ অ–১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা খেলোয়াড় আলপি আক্তার সুযোগ পেয়েছেন জাতীয় দলেবাফুফে

৬ মার্চ নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ র‍্যাঙ্কিংয়ের ৯ নম্বর দল উত্তর কোরিয়া। ১৯৮৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১০ বার এশিয়ান কাপ খেলা দেশটি ২০০১, ২০০৩ ও ২০০৮ সালে শিরোপা জিতেছে। আর পাঁচবার এই টুর্নামেন্টে খেলা উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ দৌড় গ্রুপ পর্ব পর্যন্ত। ৯ মার্চ গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাদের মুখোমুখি হবেন বাংলাদেশের মেয়েরা।‎

১২ দলের টুর্নামেন্টে ৩ গ্রুপে থাকা চারটি করে দল লড়বে নকআউটের জন্য। তিন গ্রুপের সেরা দুটি করে মোট ছয় দল সরাসরি যাবে কোয়ার্টার ফাইনালে। গ্রুপ পর্বে তৃতীয় হওয়া তিন দলের সেরা দুই দলও পাবে শেষ আটে খেলার সুযোগ।

কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা আট দলের সুযোগ থাকবে ২০২৭ ব্রাজিল বিশ্বকাপ এবং ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে খেলার।

নারী এশিয়ান কাপের বাংলাদেশ দল

গোলরক্ষক: রুপনা চাকমা, মিলি আক্তার, স্বর্ণা রানী। ডিফেন্ডার: আফঈদা খন্দকার (অধিনায়ক), কোহাতি কিসকু, নবীরন খাতুন, শিউলি আজিম, শামসুন্নাহার সিনিয়র, হালিমা খাতুন, সৌরভী আফরিন। মিডফিল্ডার: স্বপ্না রানী, মুনকি আক্তার, আইরিন খাতুন, শাহেদা আক্তার, উমহেলা মারমা, ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা, আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী, উন্নতি খাতুন। ফরোয়ার্ড: আলপি আক্তার, সৌরভী আকন্দ, মোসাম্মত সুলতানা, তহুরা খাতুন, মোসাম্মত সাগরিকা ও শামসুন্নাহার জুনিয়র। ‎স্ট্যান্ডবাই: অর্পিতা বিশ্বাস, সিনহা জাহান, শান্তি মার্ডি, তনিমা বিশ্বাস।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় যৌথভাবে এই ফুটবল উৎসবে অংশ নেবে ৪৮টি দেশ। ভেন্যুও ছড়িয়ে আছে তিন দেশের বিশাল মানচিত্রজুড়ে। স্বাভাবিকভাবেই এই বিশাল যজ্ঞে অংশ নেওয়া দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার নাম ‘লজিস্টিকস’। বিশেষ করে টুর্নামেন্ট চলাকালে ঘাঁটি বা ‘বেস ক্যাম্প’ কোথায় করা হবে, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করতে হচ্ছে দলগুলোকে।

সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গাটি নিজেদের দখলে নিতে ফিফার কাছে দৌড়ঝাঁপ করছে দলগুলো। যদিও এখনো সব দলের ‘বেস ক্যাম্প’ চূড়ান্ত হয়নি, তবে অনেক বড় দলই এরই মধ্যে ঠিকানা ঠিক করে ফেলেছে।

‘বেস ক্যাম্প’ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলগুলো অনেক কিছু মাথায় রাখে। হোটেলের মান, অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা, অনুশীলন ভেন্যুতে যাতায়াতের সহজ পথ থেকে শুরু করে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা—সবকিছুই হতে হয় নিখুঁত।

২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য এখন পর্যন্ত কোন দেশগুলো তাদের ‘বেস ক্যাম্প’ চূড়ান্ত করেছে, তা জানিয়েছে দ্য অ্যাথলেটিক।

ক্রোয়েশিয়া: আলেকজান্দ্রিয়া, ভার্জিনিয়া

ক্রোয়েশিয়া তাদের আস্তানা গাড়ছে ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আলেকজান্দ্রিয়ায়। তাদের থাকার জন্য ঠিক করা হয়েছে শহরের একটি বিলাসবহুল হোটেল। আর অনুশীলনের জন্য তারা বেছে নিয়েছে শহরের এপিসকোপাল হাইস্কুলকে। দলটির কোচ জ্লাতকো দালিচ জানিয়েছেন, অনুশীলনের সুযোগ, হোটেল এবং যাতায়াতের সুবিধা—সবকিছুর বিচারে আলেকজান্দ্রিয়াই তাদের জন্য সেরা।

এই মাঠে অনুশীলন করবে ক্রোয়েশিয়া
এই মাঠে অনুশীলন করবে ক্রোয়েশিয়াফিফা

জার্মানি: উইনস্টন-সালেম, নর্থ ক্যারোলাইনা

জার্মানরা ডেরা বাঁধছে নর্থ ক্যারোলাইনার উইনস্টন-সালেমে। ওয়েইক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটি হবে তাদের মূল কেন্দ্র। এই ইউনিভার্সিটির ফুটবল–ঐতিহ্য বেশ পুরোনো। ২০০৭ সালে তারা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিল এবং ছয়বার সেমিফাইনালে খেলার অভিজ্ঞতা আছে তাদের। জার্মান ফুটবলাররা থাকবেন ‘গ্রেইলিন এস্টেট’-এ।

স্পেন: চ্যাটানুগা, টেনেসি

সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন বেছে নিয়েছে টেনেসি অঙ্গরাজ্যের চ্যাটানুগা শহরকে। টেনেসি নদীর তীরে ১ লাখ ৯০ হাজার জনসংখ্যার এই ছোট্ট শহরের এম্বেসি সুইটস হোটেলে থাকবে স্প্যানিশরা। আর তাদের প্র্যাকটিস চলবে বেলর স্কুলে। গত ক্লাব বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড সিটি দলটিও এখানেই অনুশীলন করেছিল।

ইয়ামালদের বেস ক্যাম্প টেনেসির চ্যাটানুগায়
ইয়ামালদের বেস ক্যাম্প টেনেসির চ্যাটানুগায়এএফপি

উরুগুয়ে: প্লেয়া দেল কারমেন, মেক্সিকো

বিশ্বকাপের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বেস ক্যাম্পটি সম্ভবত হতে যাচ্ছে উরুগুয়ের। পর্যটকদের স্বপ্নের গন্তব্য মেক্সিকোর প্লেয়া দেল কারমেনে থাকবে দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। সাদা বালু আর নীল সমুদ্রের এই পর্যটনকেন্দ্রে অবকাঠামোগত সুবিধা যেমন দারুণ, তেমনি এখান থেকে অন্য ভেন্যুতে যাওয়ার সময়ও কম লাগবে।

ব্রাজিল: মরিসটাউন, নিউজার্সি

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বেছে নিয়েছে একদম ঝকঝকে নতুন এক স্থাপনাকে। এমএলএস দল নিউইয়র্ক রেড বুলসের নতুন ঘাঁটি ‘রেড বুল পারফরম্যান্স সেন্টার’-এ (বিশ্বকাপের সময় যার নাম হবে কলাম্বিয়া পার্ক ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি) অনুশীলন করবে সেলেসাওরা। নিউইয়র্ক সিটি থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরের এই সেন্টারে ৮টি পূর্ণ মাপের ফুটবল মাঠ রয়েছে।

ব্রাজিল এবার ঘাঁটি গাড়ছে নিউইয়র্কে
ব্রাজিল এবার ঘাঁটি গাড়ছে নিউইয়র্কেছবি: রয়টার্স

ফ্রান্স: বোস্টন, ম্যাসাচুসেটস

২০২২ বিশ্বকাপের রানার্সআপ ফ্রান্স আস্তানা গাড়ছে ঐতিহাসিক বোস্টন শহরে। দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা থাকবেন ফোর সিজনস হোটেলে। আর বাবলসন কলেজের মাঠে চলবে তাঁদের অনুশীলন। ফ্রান্স তাদের গ্রুপের শেষ ম্যাচটি খেলবে নরওয়ের বিপক্ষে, জিলেট স্টেডিয়ামে।

আর্জেন্টিনা: কানসাস সিটি, মিসৌরি

মেসিরা আস্তানা বানাবেন কানসাস সিটিতে
মেসিরা আস্তানা বানাবেন কানসাস সিটিতে, এএফপি
 

বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আস্তানা গড়ছে কানসাস সিটিতে। তারা এমএলএস দল স্পোর্টিং কেসির প্র্যাকটিস মাঠ ব্যবহার করবে। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) জানিয়েছে, দূরত্বের কথা চিন্তা করলে কানসাস সিটিই টুর্নামেন্টে তাদের জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা। টানা ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে নামবেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনা নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলবে কানসাস সিটি চিফস-এর অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে।

সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে মুকুট ধরে রাখা হলো না বাংলাদেশের। নেপালের পোখারায় আজ ফাইনালে ভারতের কাছে ৪-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে লাল-সবুজের মেয়েদের। দলগতভাবে দিনটি আক্ষেপের হলেও ব্যক্তিগত অর্জনে টুর্নামেন্ট রাঙিয়েছেন বাংলাদেশের আলপি আক্তার। চার দেশের এই টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতার পাশাপাশি সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জিতেছেন পঞ্চগড়ের এই উদীয়মান ফরোয়ার্ড।

ফাইনালে আজ গোল পাননি আলপি। কিন্তু লিগ পর্বে ছিলেন দুর্দান্ত। ওই পর্বে বাংলাদেশের করা ১৮ গোলের মধ্যে একাই করেছেন ৭ গোল। ভুটান ও নেপালের বিপক্ষে করেছেন হ্যাটট্রিক। নেপালের বিপক্ষে তাঁর হ্যাটট্রিকই বাংলাদেশকে ফাইনালে তুলেছিল। টুর্নামেন্টে তাঁর ‘গোল্ডেন বুট’ জয়টা একরকম নিশ্চিতই ছিল।

সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার পাওয়াটা আলপির জন্য ছিল বিশেষ চমক। বাফুফের নারী উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন। মাঠে চমৎকার বল নিয়ন্ত্রণ আর আক্রমণে নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতায় আলপি মুগ্ধ করেছেন বিচারকদের। শিরোপা হারানোর বিষাদে তাঁর মুখটা কিছুটা গুমড়ো হয়ে থাকলেও দেশের জন্য এই ‘ডাবল’ অর্জন মোটেও কম গৌরবের নয়। মঞ্চে তাঁকে অভিনন্দন জানান সাফ সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন।

টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাও আলপি
টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাও আলপি, বাফুফে

আলপির এই কীর্তি মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০২৪ সালের সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ আসরকে। সেবার বাংলাদেশের সাগরিকা ৪ গোল করে একই সঙ্গে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন। আলপি যেন সেই গৌরব আবার ফিরিয়ে আনলেন।

আলপির এই ধারালো পারফরম্যান্স অবশ্য হঠাৎ করে আসা কিছু নয়। সর্বশেষ নারী লিগে সিরাজ স্মৃতি সংসদের হয়ে ১১ গোল করেছিলেন তিনি। বর্তমানে ঘরোয়া লিগেও আছেন দুর্দান্ত ফর্মে। রাজশাহী স্টারসের জার্সিতে ৮ ম্যাচে ৩ হ্যাটট্রিকসহ ২৫ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে তিনি সবার আগে।

টুর্নামেন্টে সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার পেয়েছেন ভারতের মুন্নি। এ ছাড়া ফেয়ার প্লে ট্রফিও গেছে ভারতের ঘরে।

বাংলাদেশ ০:৪ ভারত

নেপালের পোখারায় আক্ষেপের গল্প লিখল বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ নারী ফুটবল দল। যে নেপাল বরাবরই বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য ‘পয়মন্ত’ হিসেবে পরিচিত, সেই নেপালেই আজ ধরাশায়ী হতে হলো লাল-সবুজের মেয়েদের। সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে বাংলাদেশকে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করে শিরোপা জিতেছে ভরত।

কয়েক মাস ধরে ভারত-বাংলাদেশ ফুটবল লড়াইয়ে একক আধিপত্য ছিল বাংলাদেশের। নভেম্বরে পুরুষ ফুটবল এবং গত মাসে নারী ফুটসালে জয়ের পর এই সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলের লিগ পর্বেও জয় এসেছিল। কিন্তু ফাইনালের মঞ্চে এসে ফল পাল্টে দিয়েছে ভারতের মেয়েরা।

পোখারার এবড়োখেবড়ো মাঠে রক্ষণ ও গোলকিপারের ভুলই বাংলাদেশের হারের বড় কারণ। লিগ পর্বে ভারতকে ২-০ গোলে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা বাংলাদেশ ফাইনালে ছিল নিজেদের ছায়া হয়ে। ম্যাচে আধিপত্য ধরে রাখা দূরের কথা, রক্ষণের মারাত্মক সব ভুলে গোল হজম করতে হয়েছে একের পর এক। ম্যাচের অনেকটা নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে চলে যায় প্রথমার্ধেই।

৪০ মিনিটে বাঁ দিক থেকে আসা একটি ক্রসে বাংলাদেশের ডিফেন্ডাররা পজিশন হারিয়ে ফেললে অরক্ষিত অবস্থায় বল পান ভারতের এক ফরোয়ার্ড। তিনি আলতো করে বল ঠেলেন অধিনায়ক জুলান নংমাইথেমকে। খুব কাছ থেকে বল জালে জড়াতে ভুল করেননি মনিপুরের মেয়ে।

দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর বদলে ৬০ মিনিটে পিছিয়ে থাকার ব্যবধান দ্বিগুণ হয়। বক্সে ভারতের ফরোয়ার্ড আলভা দেবী বাংলাদেশের গোলকিপার ইয়ারজান বেগম ও এক ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পড়ে যান। ভুটানি রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজানোর পর লক্ষ্যভেদ করেন এলিজাবেদ লাকড়া।

৬৮ মিনিটে গোলকিপার ইয়ারজানের ভুলে শেষ হয়ে যায় সব আশা। বদলি খেলোয়াড় প্রতীমার ব্যাকপাস ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভারতের পার্ল ফার্নান্দেজের গায়ে বল মারেন ইয়ারজান। ফিরতি শটে ফাঁকা জালে বল ঠেলে দিতে ভুল করেননি ফার্নান্দেজ। আগেভাগেই হেরে বসা বাংলাদেশ ৮৩ মিনিটে হজম করে চতুর্থ গোল (গোলদাতা অন্বিতা রঘুরামন)।

সাফ অনূর্ধ্ব-১৮, ১৯ ও ২০—এই তিন বিভাগের সর্বশেষ ৬টি আসরের ৫টিতেই চ্যাম্পিয়ন ছিল বাংলাদেশ। অনূর্ধ্ব-১৯ বিভাগে হওয়া ২০২৪ আসরে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ছিল বাংলাদেশ ও ভারত। এবার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করা বাংলাদেশের মেয়েরা ফাইনালের আগপর্যন্ত ছিল অপ্রতিরোধ্য। ফাইনালের আগে পিটার বাটলারের মেয়েরা তিন ম্যাচে ১৮ গোল করে কোনো গোল হজম করেনি। ভারত তিন ম্যাচে করে ৯ গোল, হজম করেছিল ২ গোল।

এই টুর্নামেন্টটি মূলত আগামী মাসে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এএফসি নারী এশিয়ান কাপের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছিলেন কোচ পিটার বাটলার। যদিও সিনিয়র ফুটবলাররা নেই এই দলে। তবে ফাইনালের এমন হার কোচ এবং খেলোয়াড়দের জন্য বড় এক সতর্কবার্তা হয়েই থাকল।
টুর্নামেন্টে দুটি হ্যাটট্রিকসহ  ৭টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা বাংলাদেশের আলপি আক্তার। মুনকি আক্তার করেছেন ৪টি গোল।

ঢাকা